মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

চন্দ্রাবতীর শিব মন্দির

চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মহিলা কবি ৷ তাঁর পিতা মনসা মঙ্গল কাব্যের অন্যতম রচয়িতা দ্বিজ বংশী দাস এবং মাতার নাম সুলোচনা ৷ তাঁর জন্ম ষোড়শ শতাবদীতে বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার পাটোয়ারী গ্রামে ৷ তাঁর রচনাগুলির মধ্যে মনুয়া, দস্যু কেনারামের পালা ও রামায়ণ কথা (অসমাপ্ত) অন্যতম ৷

তবে একজন সাহিত্যিকের থেকেও তাঁর অস্তিত্ত্ব কিংবদন্তীতেই আরো বেশী ৷ মৈমনসিংহ গীতিকায় তার কথা পাওয়া যায় ৷ তাঁর নিজের জীবনের ট্র্যাজেডি নিয়ে রচিত লোকগাঁথা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবিভক্ত মৈমনসিংহ জেলার মানুষের মুখে মুখে ফিরে এসেছে ৷

"চাইরকোণা পুস্কুনির পারে চম্পা নাগেশ্ব,
ডাল ভাঙ্গ পুষ্প তুল কে তুমি নাগর ৷"

"আমার বাড়ী তোমার বাড়ী ঐ না ঐ  নদীর পার,
কি কারণে তুল কন্যা মালতীর হার ৷"

"প্রভাতকালে আইলাম আমি পুষ্প তুলিবারে,
বাপেত করিব পূজা শিবের মন্দিরে ৷"

বাল্যকালে চন্দ্রাবতীর বন্ধু ও খেলার সাথী ছিলেন জয়ানন্দ নামের এক অনাথ বালক ৷ জয়ানন্দের নিবাস সুন্ধা গ্রামে ৷ জয়ানন্দ তাঁর মাতুলগৃহে পালিত ৷ দ্বিজ বংশীদাসের অনেক রচনায় এই দুজনার রচিত ছোট ছোট অনেক পদ রয়েছে ৷ কৈশোর উত্তীর্ন হলে দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন বলে স্থির করেন ৷ বিবাহের দিনও স্থির হয় ৷ ইতিমধ্যে জয়ানন্দ অন্য এক রমনীর প্রেমে পড়ে যান ৷ স্থানীয় মুসলমান শাসনকর্তা বা কাজীর মেয়ে আসমানীর অসামান্য রূপে মুগ্ধ হয়ে জয়ানন্দ আসমানীকে একাধিক প্রেমপত্র লেখেন ৷ এই ত্রিকোন প্রেমের ফলাফল হয় মারাত্মক ৷ জয়ানন্দের সাথে চন্দ্রাবতীর প্রেমের কথা জেনেও আসমানী তার পিতাকে জানান তিনি জয়ানন্দকে বিবাহ করতে চান ৷ কাজী জয়ানন্দকে বলপূর্ববক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে আসমানীর সঙ্গে তার বিবাহ দেন ৷ ঘটনাটি ঘটে যেদিন জয়ানন্দ ও চন্দ্রাবতীর বিবাহের দিন স্থির হয়েছিল সেই দিন ৷ সেদিন সন্ধ্যাবেলা চন্দ্রাবতী বিবাহের সাজে পিত্রালয়ে বসে ছিলেন ৷ তখনই সংবাদ পেলেন জয়ানন্দ ধর্মান্তরিত হয়ে অনত্র্য বিবাহ করেছেন ৷

ঢুল বাজে ডাগর বাজে জয়াদি জুকার
মালা গাথে কুলের নারী মঙ্গল আচার
এমন কালে দৈবেতে করিল কোন কাম
পাপেতে ডুবাইল নাগর চৈদ্দ পুরুষের নাম


এরপর শুরু হয় চন্দ্রাবতীর বিরহ বিধুর জীবন ৷ তিনি পিতার কাছে অনুমতি নেন যে সারা জীবন অবিবাহিত থেকে তিনি শিবের সাধনা করবেন ৷

‘রাত্রিকালে শরশয্যা বহে চক্ষের পানি।

বালিশ ভিজিয়া ভিজে নেতের বিছানি ’

 

চন্দ্রাবতী বলে "পিতা মম বাক্য ধর
জন্মে না করিব বিয়া রইব আইবর
শিবপূজা করি আমি শিবপদে মতি
দুঃখিনীর কথা রাখ কর অনুমতি"

 

অনুমতি দিয়া পিতা কয় কন্যার স্থানে
"শিবপূজা কর আর লেখ রামায়ণে"

তাঁর পিতা তার জন্য একটি শিবের মন্দির নির্মান করিয়ে দেন ৷ সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ চন্দ্রাবতীর কৈশোরকাল থেকেই ছিল ৷ তিনি বাকী জীবন শিবের উপাসনা ও সাহিত্যচর্চা করে কাটাবেন বলে স্থির করেন ৷ ইতিমধ্যে বেশ কিছুকাল পরে জয়ানন্দ বুঝতে পারেন যে, আসমানীর প্রতি তার টানটা ছিল মোহ মাত্র ৷ মনের থেকে তিনি চন্দ্রাবতীকেই প্রকৃত ভালবাসেন ৷ জয়ানন্দ স্থির করেন যে চন্দ্রাবতীকে তাঁর মনের কথা জানাবেন ৷


এক সন্ধ্যায় জয়ানন্দ ও চন্দ্রাবতীর বিচ্ছেদ হয়েছিল ৷ অপর সন্ধ্যায় সেই বিচ্ছেদ মুছে গিয়ে মিলন হবে দুজনার এই আশায় জয়ানন্দ রওনা দিলেন পাটোয়ারী গ্রামে ৷ জয়ানন্দ যখন গন্তব্যস্থলে পৌঁছলেন তখন সূর্য্যাস্ত হয়ে গেছে, তখন দিন ও বাত্রির সন্ধিক্ষন ৷ শিব মন্দিরের ভেতর দ্বার রুদ্ধ করে সন্ধ্যারতি ও তপজপে নিজেকে নিবদ্ধ করেছেন চন্দ্রাবতী ৷ জয়ানন্দ মন্দিরের দ্বারে এসে কয়েকবার ডাকলেন চন্দ্রাবতীকে ৷অমৃত ভাবিয়া আমি খাইয়াছি গরল ৷ কিন্তু দ্বার রুদ্ধ থাকায় এবং একাগ্রমনে ধ্যানে নিমগ্ন থাকায় সেই শব্দ প্রবেশ করল না চন্দ্রাবতীর কানে ৷ ব্যার্থ প্রেমিক জয়ানন্দ তখন লালবর্ণের সন্ধ্যামালতী ফুল দিয়ে মন্দিরের দ্বারে চারছত্রের একটি পদে চন্দ্রাবতী ও ধরাধামকে চিরবিদায় জানিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করেন ৷

শৈশব কালের সংগী তুমি যৈবন কালের সাথী।

অপরাধ ক্ষমা কর তুমি চন্দ্রাবতী

পাপিষ্ঠ জানিয়া মোরে না হইলা সম্মত।

বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মত

 

অনেক পরে মন্দির থেকে বেরিয়ে চন্দ্রাবতী বুঝতে পারেন যে দেবালয় কলুসিত হয়েছে ৷ দ্বার পরিস্কার করার জন্য তিনি কলসী কাঁধে জল আনতে যান পার্শ্ববর্তী ফুলেশ্বরী (স্থানীয় নাম ফুলিয়া) নদীতে ৷ ঘাটে পৌঁছেই চন্দ্রাবতী বুঝলেন সব শেষ ৷ ফুলেশ্বরীর জলে নিজেকে নিমগ্ন করে প্রাণত্যাগ করেছেন জয়ানন্দ ৷ প্রাণহীন দেহ ভাসছে ফুলেশ্বরীর জলে ৷ এই অবস্থায় নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না চন্দ্রাবতী ৷ তিনিও প্রেমিকের সাথে পরলোকে চিরমিলনের কামনায় ফুলেশ্বরীর জলে ডুবে প্রাণত্যাগ করেন ৷

জয়ানন্দের গ্রাম সুন্ধা খুঁজে পাওয়া যায়নি ৷ তবে ইতিহাসের মর্মন্তুদ বিরহের স্মৃতি নিয়ে আজ ও দাঁড়িয়ে আছে বাংলার প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর শিব মন্দির ৷ বর্তমানে নদীটির কোন চিহ্ন না থাকলেও মন্দিরটি কালের সাক্ষী হয়ে, প্রেমের সাক্ষী হয়ে নিজস্ব মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরটি নির্মাণশৈলীর শৈল্পিক বৈশিষ্ট উল্লেখযোগ্য। মন্দিরটি অষ্টকোনাকৃতির। উচ্চতা ১১ মিটার। আটটি কোনার প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য এক দশমিক সাত মিটার। নিচের ধাপে একটি কক্ষ এবং কক্ষে যাবার জন্য একটি দরজা রয়েছে। ভেতরে শিবমূর্তি রয়েছে। শিব পুজা হয়। নিচের অংশটি দুই ধাপে নির্মিত হয়েছে। নিচের ধাপের চারিদিক প্রায় অর্ধবৃত্তাকার খিলানের সাহায্যে নির্মিত। প্রশস্ত কুলঙ্গি রয়েছে। নিচের ধাপের কার্ণিশ পর্যন্ত উচ্চতা ২.৭ মিটার। কক্ষের ভেতরে সাতটি জানালার মতো কুলঙ্গি রয়েছে। যার প্রস্ত ৫২ সে. মি. এবং দৈর্ঘ্যে ৯৯ সে.মি.। কিছু অনবদ্য কারুকার্যও রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপটি সরলরেখায় নির্মিত। এ পর্যায়টি অর্ধবৃত্তাকার খিলানের সাহায্যে তৈরী এবং এতেও আছে প্রশস্ত কুলঙ্গি। চূড়ার শেষ প্রান্তে খাঁজ কাটা কারুকাজ এবং কলসাকৃতি চূড়ার শীর্ষে আছে ডাটার আকারে ‘ফাইনিয়েল’।

শরীফুল ইসলাম, নীলগঞ্জ